ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নিয়ে
স্থপতি আমিনুল ইসলাম ইমনের মতামত

ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নিয়েস্থপতি আমিনুল ইসলাম ইমনের মতামত

ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আমরা স্থপতিরা তিনবার কাঁটা- ছেড়া করেছি, এবং প্রতিবারই কিছু অনাকাংখিত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রথমবার, ৭ই মার্চের বংবন্ধুর ভাষণ ও নিয়াজীর আত্মসমর্পণের নিশানা মুছে দিয়ে তার উপরে শিশু পার্ক বানানো। দ্বিতীয়বার, নির্বিচারে গাছ কেটে স্বাধীনতা স্তম্ভ করা হয়েছে। বর্তমানে তৃতীয়বারের মত আরেক দফা নির্বিচার গাছ কেটে রেস্তোরা, টয়লেট, পার্কিং, সহ বিশাল আকারের সবুজকে কনক্রিটের ঢালাই দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এবং ঐতিহাসিক স্থান সুরক্ষার নামে দায়সারা কাজ করা হচ্ছে বরং পার্কের প্রায় এক তৃতীয়াংশ যায়গা জুড়ে এমন ভাবে লক্ষ টন কনক্রিট বিছানো হয়েছে যে সেখানে আর কোনদিন কোন গাছ হবে না।

উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য গুলো কি কি ছিল?
1. মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরা। অর্থাৎ স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচাইতে গুরুত্মপূর্ন দুটা মূহুর্ত ধারণ করা। এক, মুক্তিযুদ্ধের শুরু অর্থাৎ জাতির পিতার ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণ এবং দুই, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ১৬ই ডিসেম্বর পরাজিত পাক হানাদার বাহিনীর অস্ত্র সমর্পণ এর মাধ্যমে আত্ম-সমর্থন। এই ঐতিহাসিক স্থান দুটাকে চিনহিত করা, করে সেখানে কোন একটি সিম্বল বা মনুমেন্ট স্থাপন করে ওই স্থানটিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা।
2. ইতোমধ্যে স্থাপিত স্বাধীনতা স্তম্ভ ও জাদুঘরে প্রবেশ ও দেখার সুব্যবস্থা করা। মেট্রো-রেল, বাস, রিকশা, গাড়ি, ইত্যাদি পরিবহনের মানুষ নামানো ও ওঠানোর জন্য সুব্যবস্থা রাখা।
3. ঐতিহাসিক ভাবে এই উদ্যান একটা খেলাধুলা, জনসভা, বইমেলা ও আনন্দ ভ্রমণের জন্য বহুল ব্যাবহৃত বিধায় প্রচুর মানুষের জন-সমাগমকে ধারণ করে এরকম বহু ব্যাবহার উপযোগী খোলা যায়গা
4. ঢাকার একমাত্র সরকারী ও সাশ্রয়ী শিশু পার্ককে আরও সুন্দর করে তৈরি করা।
5. সাথে কিছু আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা যেমন টয়লেট, যাত্রী ছাউনি ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। পাবলিক সার্ভিস এর ব্যবস্থা করা।
6. ঢাকা শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বনানীকে রক্ষা করে উপরোক্ত সব গুলো কাজ করা।

কীভাবে করলে কাজ গুলো আরও অনেক ভালভাবে করা যেত?
১। স্বাধীনতার ইতিহাসকে তুলে ধরা
স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দুটিকে সবচাইতে অবহেলিত স্থানে রাখা হয়েছে। পথের পাশে, ড্রেনের পাশে অল্প খানিকটা যায়গায়। প্রায় দেখাই যায় না। এখানে এখন যত সুন্দর স্থাপনা বা ভাস্কর্য তৈরি করা হোক না কেন সেটা্র সেটিং ও ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে ব্যাপারটা সঠিক মর্যাদা-পূর্ন না হবার আশংকা আছে। তাছাড়া গাড়ির গ্যারেজের উপরে বংগবন্ধুর ভাষণের মঞ্চ কেন হতে হবে? কেন, গাড়ির এঞ্জিনের শব্দ, ভাইব্রেশন, কালো ধোয়া, ও পেছনে শিশু-পার্কের বাচ্চাদের চিৎকারের কাছে এই স্থাপনা করা হল। বঙ্গবন্ধুর মঞ্চের সম্মান রক্ষার্থে এসব পরস্পর বিরোধী স্থাপনা গুলিকে আরও দূরে দেওয়া উচিত ছিল।
উচিত ছিল দুইটা মহা গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে দুইটা আলাদা চত্বরের কেন্দ্রে রাখা যেত। দুই চত্বরের সংযোগ পথে ৭ই মার্চ থেকে শুরু করে ৯ মাস ৯ দিনের যে যুদ্ধ তার ইতিহাস তুলে ধরা। এটা একটা মনোমুগ্ধকর ও শিক্ষণীয় জার্নি হতে পারত।
প্রথম চত্তরে শুধুই বঙ্গবন্ধু ও তার ঐতিহাসিক ভাষণের গমগমে আওয়াজ থাকতে পারত। শতাব্দীর সেরা সংলাপ গুলোকে দু-দণ্ড দাঁড়িয়ে বা বসে শোনার জন্য কোন সুব্যবস্থা নাই কেন? কনক্রিটের উত্তাপে সেখানে দাঁড়ানো যাবে কি? বরং ওখানে ভিড় করে দাড়াতে গেলে পাশেই ড্রেনে পরে যাবে কি না? ওই ড্রেইনের পানির ময়লা প্রতিদিন প্রিষ্কার করা হবে? একই কথা নিয়াজীর আত্মসমর্পণের যায়গার ক্ষেত্রেও। আমরা সেখানে আত্মসমর্পণের মূহুর্তের ভাস্কর্য দেখতে চাই। লাইট এন্ড শো বা অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সেই দুর্লভ মুহূর্ত বার বার মঞ্চায়ন হতে দিতে চাই। সেই যায়গা কোথায়?
এগুলো সমাধান করেই ডিজাইন করা যেত। না করা হলে মুক্তিযুদ্ধের সবচাইতে ঐতিহাসিক স্থানের সঠিক মর্যাদা দেওয়া হল বলে মনে হচ্ছে না।
২। জনসমাগমের সুব্যাবস্থা করা
এই ঐতিহাসিক স্থান দেখতে আসবে মূলত দেশের কৃষক, শ্রমিক ও জনতা। জনসভা গুলিতেও তাই। এরা আসবে মূলত বাস, সি এনজি বা রিকশায়। এসব গন পরিবহন থেকে লোক নামা বা ওঠার সুশৃঙ্খল সুব্যবস্থা চাই। কমপক্ষে ৫০ টা বাসের এবং একশত রিকশা/সিএনজি/ বাইকের পার্কিং প্রয়োজন কিন্তু এমন কিছুই নাই। বরং আছে ৫০০ প্রাইভেট গাড়ির পার্কিং। এই ব্যবস্থা কাদের জন্য, ভিভিআইপিদের জন্য তো আশে পাশে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট, মিউজিয়াম সহ নানা যায়গায় পার্কিং এর ব্যবস্থা আছেই। এই পার্কিং কাদের স্বার্থে? আশে পাশের কোন ক্লাব বা হোটেলের জন্য কি? প্রাইভেট গাড়িতে করে কত ভাগ লোক আসবে আর গন পরিবহনে কত লোক আসবে তার হিসাব করা হয়েছে কি? করা হলে ডিজাইন অন্য রকম হবার কথা।
৩। বহু ব্যাবহার উপযোগী খোলা যায়গা
সেটার জন্য গোলাকৃতির আকৃতির বিশাল একটা যায়গা স্বাধীনতা স্তম্ভ করার সময় অপ্রয়োজনে গাছ কেটে এক দশক আগেই ন্যাড়া বানিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানেই এখন থেকে জনসভা, বইমেলা সহ সকল অনুষ্ঠান আয়োজন করা যায়। নতুন করে আরও গাছ কেটে নতুন খোলা যায়গা করা র দরকার হয় না।
৪। শিশু পার্ক
শিশু পার্ক করতে আসলে বাউন্ডারি দেওয়া আলাদা যায়গা লাগে এটা একেবারেই ভুল ধারনা। শিশু পার্ক বলে আলাদা কিছু মেকানাইজড রাইড দিলেই সেটা শিশু পার্ক হয়ে যায় না। এটা এদেশের পার্ক ডিজাইনারদের মাথায় নাই। তারা সিঙ্গাপুরের সেস্তোসা আইল্যান্ড ঘুরে আসেন, লস এঞ্জেলসের ডিজনি ল্যান্ড ঘুরে আসেন, কিন্তু কিছু শিখে আসেন না। শিশুরা শুধুমাত্র টিকেট কেটে প্লাস্তিকের রাইডে চড়তে আসে না। তাদের জন্য খোলা মাঠ দরকার আছে। তাদের জন্যেও স্বাধীনতা জাদুঘর দেখার দরকার আছে। তাদের জন্য গাছের ছায়ায় বাবা মা কে নিয়ে মাদুর বিছিয়ে বসে প্রকৃতির নিরবতা উপভোগ করার দরকার আছে। হ্যাঁ রাইড ও থাকবে। প্রয়োজনে সেই রাইড গুলো এই বিশাল পার্কের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে। এই পার্ক হবে শিশু, তরুণ, যুবক, ও বৃদ্ধ সবার ই আনন্দের যায়গা। কেউ তো আলাদা না। স্বাধীনতার আনন্দ যেমন সবার। শিশুতোষ আনন্দও সবার। বরং এখন যেভাবে শিশুপার্ককে কেটে দুই ভাগ করে একটা সরু টানেলের মাধ্যমে যাতায়াতের ব্যাবস্থা করা হয়েছে সেখানে ভয় মহিলা ও শিশুরা ঢুকতে চাইবে? আর্কিটেক্ট এবং প্লানারদের এক্ষেত্রে আরো বেশী ম্যাচিউরিটি নিয়ে এই ডিজাইন করতে হবে।
৫। পাবলিক সার্ভিস
পাবলিক সার্ভিস যেমন রেস্তোরা, টয়লেট, প্রাথমিক চিকিৎসা, নিরাপত্তা রক্ষীদের ভবন, প্রার্থনার যায়গা, ইত্যাদি সবই লাগবে। সে গুলোকেই বরং অল্প যায়গা খরচ করে গভীর মাটির তলায় করা যায়।
৬। বৃক্ষ নিধন
বৃক্ষ নিধন করে নতুন গাছ লাগালেই হয় না। একটা পুরাতন গাছের যে শক্তি, যে ছায়া, যে পরিমাণ মানুষকে এর নিচে ধারণ করতে পারে তা নতুন বৃক্ষ আগামী এক যুগেও পারবে না। উদাহরণ, হাতির ঝিল ও ধানমন্ডি লেক। বনায়ন দু যায়গাতেই আছে। তবে ধানমন্ডি এখন পুরোটাই ছায়া ঘেরা সুশীতল। হাতির ঝিলে এই অবস্থা আসতে আরও বহু বছর অপেক্ষা করতে হবে। তার চেয়ে বড় কথা গাছ না কেটেই সব কিছু করা যেত। এমন একটা স্থাপনা এখানে নাই যা গাছ রেখে করা যায় না। বরং গাছ থাকলেই বেশি সুন্দর হয়, বেশি দর্শক আসে। বর্তমানে নির্মাণাধীন বিরাট এলাকা জুড়ে কনক্রিটের পার্কিং এর ছাদে প্লাস্টিকের ঘাস লাগানো ছাড়া আর কিছু হবে না। গাছের শেকড়ের যায়গা আমরা খেয়ে ফেলেছি।
এখন শেষ ভরসা হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। একমাত্র তিনিই পারেন এই স্থানটির ডিজাইন পুনরায় মূল্যায়নের জন্য পাঠিয়ে উল্লেখিত সমস্যাগুলো সমাধান করে আরও উপযোগী, আরও সুন্দর এবং আরও সবুজ, জন-বান্ধব একটা ডিজাইন করতে। তার সাথে আমার স্থাপত্য বিষয় নিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছে, আমি জানি তিনি স্থাপত্য ও পরিকল্পনা বিষয়টা ভালো বোঝেন এবং নির্দেশনা দিতেও পারেন। তিনি বিষয়টার দিলে সুদৃষ্টি দেবেন বলে আমার আশাবাদ।

সুত্র” স্থপতি আমিনুল ইসলাম ইমনের ফেসবুক পোষ্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

Related Posts

বিশ্বে করোনা ভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
সুস্থ
মৃত্যু
সূত্র: আইইডিসিআর

বিশ্বে

আক্রান্ত
১৭৭,৬৮২,৮৭২
সুস্থ
১১৫,৯৩৭,২৮০
মৃত্যু
৩,৮৫১,২৬৮

সর্বশেষ