কোনও দস্যু আমেরিকার মতো এভাবে চুরি করে গর্ব করে না: ইরান

মার্কিন সরকার কথিত ইরানি তেল ট্যাংকারের জ্বালানি বিক্রি করে বিপুল অংকের অর্থ আয় করার যে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছে সে সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাঈদ খাতিবজাদে বলেছেন, “ক্যারিবিয়ান সাগরের জলদস্যুরা অন্যের জাহাজ লুট করে দম্ভভরে গর্ব করে বেড়াচ্ছে; অথচ কোনও সভ্য সমাজ চুরি করে গর্ব করতে পারে না।”

মার্কিন আইন মন্ত্রণালয় শুক্রবার এক ঘোষণায় জানায়, ভেনিজুয়েলা যাওয়ার পথে মার্কিন নৌসেনারা যেসব ইরানি তেল ট্যাংকার আটক (চুরি) করেছিল সেগুলোর তেল বিক্রি করেছে ওয়াশিংটন।
এ সম্পর্কে খাতিবজাদে নিজের অফিসিয়াল টুইটার পেজে লিখেছেন, তেহরান এর আগেও ঘোষণা করেছে ওই ট্যাংকারগুলো ইরানের নয় বরং অন্য কারও জাহাজ চুরি করেছে মার্কিন সেনারা।

মার্কিন বিচার মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট শুক্রবার জানায়, সম্প্রতি আমেরিকা জলদস্যু স্টাইলে ভেনিজুয়েলাগামী ইরানি তেলের চালান চুরি করেছিল। সেই তেল ৪ কোটি ডলারে বিক্রি করা হয়েছে বলেও আমেরিকার ওই মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তবে ইরান শুরু থেকে বলে এসেছে ওই তেল ট্যাংকারগুলো ইরানের ছিল না। #পার্সটুডে

সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে ৫০টি এফ-৩৫ জঙ্গিবিমান বিক্রি করছে আমেরিকা

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির কংগ্রেসকে জানিয়েছে, ওই মন্ত্রণালয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে ১০ বিলিয়ান ডলার মূল্যের ৫০টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করার বিষয়টি অনুমোদন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদিবাদী ইসরাইলের সামরিক প্রাধান্য নিশ্চিত রাখতে হবে বলে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সতর্ক করার পরও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হলো।

এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্স গতমাসে জানিয়েছিল, আগামী ২ ডিসেম্বর আরব আমিরাতের জাতীয় দিবস পালনের আগেই ট্রাম্প প্রশাসন আবু ধাবির সঙ্গে এফ-৩৫ জঙ্গিবিমান বিক্রির ব্যাপারে একটি প্রাথমিক চুক্তি সম্পাদন করতে চায়।

তবে মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক কমিটি এবং প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটি এ ধরনের চুক্তি পর্যালোচনা করে তা বাতিল করতে পারে।

গত আগস্ট মাসে ফিলিস্তিন দখলদার ইসরাইলের সঙ্গে আবু ধাবি কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেয়ার পর মার্কিন সরকার সংযুক্ত আরব আমিরাতকে এফ-৩৫ জঙ্গিবিমান দিতে সম্মত হয়। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই চুক্তির ব্যাপারে ইহুদিবাদী ইসরাইল অনাপত্তি জানানোর পরই কেবল আবু ধাবিকে অত্যাধুনিক এই জঙ্গিবিমান দিতে সম্মত হয়েছে ওয়াশিংটন।#পার্সটুডে

৫ মাসে বেড়েছে ৮ বিলিয়ন ডলার
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছাড়াল ৪১ বিলিয়ন ডলার

প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। গতকাল দিন শেষে দেশের রিজার্ভ নতুন এ উচ্চতায় পৌঁছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ১০৩ কোটি ডলার, বাংলাদেশী মুদ্রায় যা ৩ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে দেশের প্রায় ১০ মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব।

নভেল করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে বড় ধাক্কা খেয়েছে দেশের আমদানি খাত। ব্যবসা, ভ্রমণ, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশীদের বিদেশ যাত্রাও প্রায় বন্ধ। অন্যদিকে রেমিট্যান্সে বড় উল্লম্ফনের পাশাপাশি রফতানি খাত ঘুরে দাঁড়ানোয় ক্রমেই বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। গত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার।

রেমিট্যান্সের বড় প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড়াতে সহায়তা করেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, জুন থেকে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। প্রবাসীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন। দেশের রফতানি খাতও করোনাসৃষ্ট বিপর্যয় কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের শীর্ষ দুটি খাতের প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ দাতা সংস্থাগুলোর ঋণসহায়তা বাড়ছে। এতে রিজার্ভের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। একই সময়ে রফতানি আয়ে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুটি উৎস ইতিবাচক ধারায় থাকলেও ব্যয়ের খাত সংকুচিত হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আমদানি ব্যয় কমেছে ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তুলনায় ব্যয় কম হওয়ায় সরকারের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ৩৫৩ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত থেকেছে। যদিও কয়েক বছর ধরে চলতি হিসাবে বড় ঘাটতি ছিল।

গত ৩ জুন দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ২৪ জুন সেই রিজার্ভ আরো বেড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই ৩০ জুন রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। এরপর ২৮ জুলাই রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরও অতিক্রম করে। তিন সপ্তাহ পর গত ১৭ আগস্ট রিজার্ভ ৩৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। পরে তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারে। ৮ অক্টোবর রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলকও ছাড়িয়ে যায়। উন্নতির এ ধারাবাহিকতায় অক্টোবর শেষ হওয়ার আগেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪১ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল।

নভেল করোনাভাইরাস সৃষ্ট মহামারীতে আর্থিক বিপর্যয়ে পড়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এক কোটির বেশি বাংলাদেশী। মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের বড় অংশই কর্মস্থলে ফিরে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন। দেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরবের নতুন ভিসা বন্ধ। ছুটিতে দেশে ফেরা ৫০ হাজারের বেশি বাংলাদেশী এখনো সৌদি আরবে ফিরতে পারেননি। অন্যতম শ্রমবাজার কুয়েতে ফিরতে পারছেন না ছুটিতে দেশে আসা বাংলাদেশীরা। তার পরও চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশের রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত আছে চলতি মাসেও। মূলত প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার ওপর ভর করেই ৪১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে রিজার্ভ।

ভার্চুয়াল সংলাপে বক্তারা
পিপিপিতে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের ব্যাপক উন্নয়ন করতে পারে চীন

চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে বড় কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বাংলাদেশে কাজ করতে আগ্রহী চীন। গতকাল এক ভার্চুয়াল সংলাপে আলোচনায় এসব কথা উঠে আসে।

গতকাল ‘বাংলাদেশ-চায়না ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন: এক্সপেরিয়েন্স অ্যান্ড আউটলুক’ শীর্ষক সংলাপের আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। ভার্চুয়াল সংলাপটিতে সভাপতিত্ব করেন সিপিডি চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। প্রধান অতিথি হিসেবে সংলাপে যুক্ত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে যুক্ত ছিলেন ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাহবুব উজ জামানও যুক্ত ছিলেন সংলাপে।

সংলাপে আলোচনায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল আ ন ম মুনিরুজ্জামান এনডিসি পিএসসি (অব.), ইনস্টিটিউট ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ ইউনানের সামাজিক বিজ্ঞান একাডেমি কুনমিং চীনের অধ্যাপক চেং মিন এবং চীনের বেইজিংয়ের দক্ষিণ এশিয়ান স্টাডিজ ইনস্টিটিউট অব কনটেম্পোরারি ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের ডেপুটি ডিরেক্টর ড. ওয়াং শিদা।

সংলাপে টিকা কূটনীতি, রোহিঙ্গা সংকট, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির (আইপিএস) মতো বৈশ্বিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়। সংলাপের উদ্দেশ্য ছিল চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক পর্যালোচনা করা এবং বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের মাধ্যমে ভবিষ্যতের দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করা।

সংলাপের প্রধান অতিথি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, আমরা চীনা বিনিয়োগকারীদের চাহিদা জানতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে খুব নিবিড়ভাবে কাজ করছি। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় ৮০০ একর জমিতে চীনা ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা হওয়ায় দেশটির বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ছে।

দুদেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। কভিড-১৯ অবস্থার উন্নতি হলে এ-জাতীয় আরো উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হবে।

সংলাপে সিপিডির চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেন, চীন যদি বাংলাদেশকে উন্নয়নের কৌশলগত বন্ধু হিসেবে নিয়ে থাকে, তাহলে চীনের বিআরআইয়ে (বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ) যুক্ত করার জন্য কাজ করতে হবে। চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে বড় কাজ করতে পারে। সম্প্রতি চীন বাংলাদেশের প্রায় আট হাজার পণ্য রফতানিতে যে শূন্য শুল্কের সুবিধা দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের মূল রফতানি পণ্য থাকতে হবে, নাহলে এর সুফল বাংলাদেশ নিতে পারবে না। সুত্র: বণিক বার্তা

বণিক বার্তায় প্রকাশিত
কৃষিপণ্য পরিবহনে ট্রাক্টর যখন সংযোগের বাহন

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে দেশ আজ অনেকটাই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিপরীতে কমছে কৃষিজমি। কৃষি শ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান হারে শিল্প, পরিবহন, নির্মাণ ও অন্যান্য খাতে স্থানান্তরের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে শ্রমিক সংকট। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা কমে আসবে। আধুনিক ও বাণিজ্যিক কৃষির প্রয়োজনে দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ অপরিহার্য। চাষাবাদ ও সেচকার্যে যন্ত্রের ব্যবহার প্রায় ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। চাষাবাদে যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান রেখে চলেছে ট্রাক্টর। তবে সাম্প্রতিক কালে এ যন্ত্রটি শুধু চাষাবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর বহুমুখী ব্যবহার দেশের গ্রামীণ জনপদে নানামুখী প্রভাব রাখছে। গ্রামীণ কৃষিপণ্য ও ভোগ্যপণ্য পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম এখন ট্রাক্টর। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষিতের হার বৃদ্ধি পেলেও সনাতন পদ্ধতির কৃষিকাজে এ প্রজন্মের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এরূপ প্রেক্ষাপটে আগামী দিনের শিক্ষিত যুবকদের কৃষিকাজে সম্পৃক্তকরণে দেশে যান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তনের কোনো বিকল্প নেই। সেখানে তরুণদের আয় উপার্জনের একটি বড় মাধ্যম হচ্ছে এ ট্রাক্টর। আবার কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি মানেই ট্রাক্টরের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। কেননা গত কয়েক দশকের ব্যবধানে দেশের কৃষিপণ্য উৎপাদন ছাড়িয়েছে সাত কোটি টন। এসব কৃষিপণ্য কৃষকের ক্ষেত থেকে বাজারে আনতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে ট্রাক্টর। কেননা এ বাহনটিই একমাত্র পরিবহন ও সহজলভ্য হিসেবে পণ্য পরিবহনে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে ট্রাক্টরের আগমন ঘটে স্বাধীনতা-পূর্বকালে, প্রথমত চা বাগান ও চিনিকলের মাধ্যমে। ষাটের দশকে কুমিল্লায় পল্লী উন্নয়ন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক স্বনামধন্য কীর্তিমান আখতার হামিদ খান কয়েকটি ট্রাক্টর আনেন এবং তা দিয়ে কুমিল্লার কোন কোন এলাকায় ট্রাক্টরের সাহায্যে কীভাবে চাষাবাদ করা যায় তা প্রদর্শন শুরু করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ও বাংলাদেশে ট্রাক্টরের প্রবেশাধিকার চা বাগান ও চিনিকলে সীমিত থাকে। স্বাধীনতা-পূর্বকালে সত্তরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে তদানীন্তন সরকার ও তখনকার কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের মাধ্যমে একপর্যায়ে কিছু ট্রাক্টর আমদানি করে কিন্তু নানা কারণে তা কৃষিকাজে তেমন ব্যবহূত হয়নি, অব্যবহূত থেকে তা একসময় নষ্টও হয়ে যায়।

স্বাধীন দেশে আধুনিক যান্ত্রিক চাষাবাদের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সময় ও শ্রমের সাশ্রয়ের জন্য মানুষের আগ্রহ একসময় বাড়তে থাকে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশে পাওয়ার টিলারের যাত্রা শুরু হয় এবং তা জনপ্রিয় হতে থাকে। মানুষের কৃষিযন্ত্রের সঙ্গে এভাবেই পরিচিতি ঘটে। কিন্তু পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের মধ্যে চাষাবাদে গুণগত কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। প্রাথমিকভাবে ট্রাক্টরের সাহায্য চাষাবাদে খরচ কমানো যায়, তাছাড়া ট্রাক্টরের লাঙল মাটির প্রায় ছয় ইঞ্চি গভীরে পৌঁছতে পারে, যা পাওয়ার টিলারের পক্ষে দুই বা তিন ইঞ্চির বেশি পৌঁছা সম্ভব হয় না। তেত্রিশ ডেসিমলের একটি জমি চাষে ট্রাক্টরের প্রয়োজন পঁচিশ বা ত্রিশ মিনিট, যা পাওয়ার টিলারের জন্য প্রয়োজন দুই ঘণ্টার ও অধিক সময়। বারবার চাষাবাদের ফলে জমির উর্বরতা কমে যাওয়ার কারণে মাটির অধিক গভীরে চাষ দিতে পারলে নিচের মাটি ওপরে আসে, ফলে মাটির উর্বরতাশক্তি বৃদ্ধি পায়। এ কারণে বাংলাদেশে যান্ত্রিক চাষাবাদের সুফল লাভের জন্য জমিতে ট্রাক্টরের মাধ্যমে চাষ করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

ট্রাক্টর দিয়ে চাষাবাদে আজকের যে ব্যপ্তি আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেখানে সরকারের সার্বিক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রাইভেট সেক্টর একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯৩ সালে আমরা কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কথা চিন্তা করি। তখন দেশে পাওয়ার টিলারে চাষাবাদ শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশ চিনি শিল্প করপোরেশন তাদের নিজস্ব খামারে কিছুসংখ্যক বেলারুশ ট্রাক্টর ব্যবহার শুরু করেছে এবং টি গার্ডেনে অল্পকিছু ট্রাক্টর ব্যবহার জনপ্রিয় হতে শুরু হলে নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে দ্য মেটাল প্রাইভেট লিমিটেড কৃষিতে ট্রাক্টর ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ভারত থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রথম ট্রাক্টর আমদানি শুরু করে। প্রথমে আমরা কুমিল্লা জেলায় কাজ শুরু করি। ট্রাক্টরে চাষাবাদ করা যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ ও দোলাচলের মুখোমুখি হই। কৃষকদের চিন্তা ছিল ছোট জমিতে কীভাবে ট্রাক্টর ঘুরবে। ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করলে ফসল ফলবে তো? অন্যের জমি বা পাশের জমি মাড়িয়ে ট্রাক্টর কীভাবে উদ্দিষ্ট জমিতে আসবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হাল ছেড়ে না দিয়ে কৃষকদের সঙ্গে আমরা কাজে লেগে থাকলাম। জমি কৃষকের মনমতোই তৈরি হতে লাগল। এভাবে কৃষকদের মধ্যে একটু একটু করে ট্রাক্টরের প্রতি আস্থার সঞ্চার হওয়া শুরু হলো।

ট্রাক্টর যখন কোনো জমিতে চাষ করত তা দেখে পাশের জমির মালিকরাও অনুরোধ করা শুরু করল যেন তাদের জমিও ট্রাক্টরে চাষ করে দেয়া হয়। এতে কৃষি শ্রমিকও কম লাগল আর সময়ও বেঁচে গেল। ট্রাক্টর দিয়ে চাষাবাদে বহু রকম সুবিধা দেখে কৃষক অত্যন্ত খুশি। এভাবে কৃষকের সাকল্য খরচ কমে গেল, পাশাপাশি ফলনও বেশি হলো। ক্রমান্বয়ে ট্রাক্টরের চাহিদা বাড়তে শুরু করল। ক্রমান্বয়ে কৃষক ট্রাক্টরে চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে আরো অন্যান্য কোম্পানি ও ট্রাক্টর আমদানিতে আগ্রহী হয় এবং বাংলাদেশে ট্রাক্টর ব্যবসা একসময় একটি শিল্পে পরিণত হয়ে ওঠে, যা বাংলাদেশের কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোতে খুব প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করছে। এরই মধ্যে সরকার ট্রাক্টরের মাধ্যমে চাষাবাদকে জনপ্রিয় করার জন্য আর্থিক সহায়তা বা প্রণোদনা প্রদান করে। সরকারের সহায়ক ভূমিকায় বাংলাদেশে ট্রাক্টরের চাষাবাদ ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। এখন বাংলাদেশে প্রায় সত্তর হাজার ট্রাক্টর বিদ্যমান, যার মধ্যে পঞ্চাশ হাজার ট্রাক্টর শুধু চাষাবাদে নিয়োজিত। ফলে বাংলাদেশের চাষাবাদে ব্যাপক গুণগত পরিবর্তন এসেছে। চাষাবাদে যন্ত্রের ব্যবহার প্রায় শতভাগের কাছাকাছিতে পৌঁছে যাওয়ায় সরকার চাষাবাদের যন্ত্রে জমি কর্ষণে আর্থিক ভর্তুকি প্রদান এখন বন্ধ করে দিয়েছে, যদিও ধান কাটা, মাড়াই ও চারা রোপণ যন্ত্রে এখনো ব্যাপকভাবে সরকার আর্থিক প্রণোদনা বা ভর্তুকি প্রদান অব্যাহত রেখেছে।

ট্রাক্টর চাষাবাদ ছাড়াও গ্রামীণ অর্থনৈতিক জীবনে এক ব্যাপক বিপ্লব সাধন করেছে। সে বিপ্লবটি এনেছে গ্রামীণ যানবাহন কাঠামোতে পণ্য পরিবহনে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে গ্রামীণ যানবাহনের মধ্যে পণ্য পরিবহনে গরুর গাড়ি একটি অপরিহার্য বাহন ছিল। কারণ স্বল্প দূরত্বে স্বল্প পণ্য পরিবহনের জন্য আর্থিকভাবে ট্রাক বা মিনি ট্রাক ব্যয়বহুল, তাছাড়া এসব পরিবহন ভাড়া করার জন্যও দূরে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হয়। ট্রাক্টর কৃষিকাজের পরে একটি ট্রলির সাহায্যে সহজে পণ্য পরিবহন করতে পারে। বাংলাদেশে এককভাবে কৃষিপণ্য পরিবহনও একটি বড় বিষয়। ২০১৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০১৭ অনুযায়ী বাংলাদেশে শুধু চাল, গম, ভুট্টার উৎপাদন হয়েছে ৩৮১.৪১ লাখ টন। নানা পর্যায়ে এসব শস্যের সঙ্গে পরিবহনের প্রশ্ন সম্পৃক্ত। প্রাথমিকভাবে জমি থেকে ধান, গম, ভুট্টা ইত্যাদিকে বাড়িতে বা চাতালে নিয়ে যেতে হয়। এ শস্যকে আবার রাইসমিল কিংবা বাজারেও নিয়ে যেতে হয়। নানাভাবে এসব পরিবহনে পরিবহন ব্যয় সাশ্রয় যেমন বড় একটি ইস্যু, তেমনি দ্রুততর পরিবহন ও ব্যবসায়িক কারণে খুব প্রয়োজন।

তাই এসব শস্যপণ্য পরিহনে ট্রাক্টর যেমন একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে, তেমনি তা পণ্য পরিবহন ও ট্রাক্টরের ব্যবহারের বহুমুখিতারও একটি বিষয় হতে পরে। বাংলাদেশে বার্ষিক শস্য উৎপাদনের বিষয়টি বিবেচনায় আনলে শুধু শস্য পরিবহনে ট্রাক্টরের ব্যবহার খুব তাত্পর্যপূর্ণ মনে হবে। শস্য বোঝাতে চাল, গম, ভুট্টার বাইরেও ডাল, তেলজাতীয় সব শস্যদানা, আলু, তরমুজ ও শাকসবজি ইতাদিও বোঝায়। বাংলাদেশে বার্ষিক শস্য উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় সাত কোটি টন।

বর্তমানে বাংলাদেশ আলু উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম স্থানে অবস্থান করছে। বছরে বাংলাদেশে আলু উৎপাদন ছাড়িয়েছে প্রায় এক কোটি টন। খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দশম স্থানে অবস্থান করছে। এর বইরেও মৌসুমি ফল যেমন আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের যে প্রবাহ শুরু হয়েছে তাতে যুক্ত হয়েছে নানা নতুন নতুন জাতের ফলও যেমন ড্রাগন ফল, মাল্টা, এভোকাডো, কোকো, আঙুর, পিচফল, রাম্বুটান ইত্যাদি। শুধু সবজি উৎপাদন হয় বর্তমানে ষাট ধরনের দুইশ জাতের। আমাদের নিজেদের আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, পেয়ারা, কলা, লেবু ইত্যাদি নানা জাতের ফল তো আছেই। এসবের বাণিজ্যিক উৎপাদনও বাংলাদেশকে বিশ্বের প্রথমসারির ফল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশের কৃষিপণ্য উৎপাদনের এ সমীক্ষায় কৃষিপণ্য পরিবহনও যুক্তিযুক্তভাবে জড়িত। প্রথমত এসবের প্রক্রিয়াকরণ স্থানে নিয়ে যাওয়া এবং তারপর বাজারজাত করা। এ ব্যাপারে পরিবহন ব্যয় কমানো, দ্রুত পরিবহন এবং গ্রামীণ সড়কে স্বচ্ছন্দে চলাচল, কৃষকের খামার বা বাড়ি, বাগান ইত্যাদিতে যাওয়ার মতো পরিবহন এসব প্রশ্নও এসেই যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুফলের কথা আলোচনা করলে মোটা দাগে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা উঠে আসে। প্রথমেই আলোচনায় আসে গ্রামীণ বা পল্লী সড়কের প্রসঙ্গ। বর্তমানে ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে পল্লী সড়ক বা গ্রামীণ সড়কের উন্নয়ন হয়েছে ১১৩২১০ কিলোমিটার। এটি বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের একটি বড় মাইলফলক, যা কেবল আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ফলে সম্ভব হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বেশির ভাগ জনগণ নিজগ্রাম থেকে সর্বোচ্চ দুই কিলোমিটারের মধ্যে পাকা সড়ক ব্যববহারের সুবিধা পায়, যে সড়ক আবার মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত। ফলে গ্রামীণ হাটবাজার কিংবা উপজেলা সদরে বা অন্য কোনো বড় মোকাম বা গ্যারেজে কৃষক সহজেই তার উৎপাদিত শস্য নিতে পারছেন। এতে কৃষক যেমন তার ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন, সঙ্গে তার এ বাড়তি আয় নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি করছে এবং নতুন কর্মসংস্থানেরও। গ্রামীণ বা পল্লী সড়ক যোগাযোগের এ সুযোগ-সুবিধা তৈরি করেছে ট্রাক্টরের জন্য। ট্রাক্টর কৃষকের চাষের কাজের পর গ্রামীণ সড়কে কৃষিপণ্য পরিবহন করে বাড়তি রোজগারের সংস্থান করতে পারছে, যা কৃষকের মাসিক লোন বা লিজের কিস্তি পরিশোধে সহায়তা করছে।

আগেই বর্ণনা করেছি বর্তমানে যে ট্রাক্টর কৃষকের হাতে পৌঁছেছে তা কৃৃষককে মাসিক কিস্তি সুবিধায় লোন বা লিজে নিতে হয়েছে। তাছাড়া এ লিজ-লোন বা মাসিক কিস্তি প্রদানে ট্রাক্টরের মালিক হওয়ার সুবিধায় গ্রামে উদ্যোক্তা শ্রেণীও সৃষ্টি হয়েছে, যারা নিজেদের ট্রাক্টর দিয়ে অন্যের জমি চাষ করে এবং বাকি সময় কৃষিপণ্য পরিবহনে ব্যাপৃত হয়। বাংলাদেশে বোরো, আমন ও আউশ এই তিনটি ধান বুননের সময়কে বিবেচনায় নিলে ট্রাক্টরকে চাষাবাদের কাজে নিয়োগের সময় সর্বোচ্চ তিন মাস কিংবা এর কমও হতে পারে। বছরের বাকি নয় মাস যদি ট্রাক্টর কর্মহীন থাকে তাহলে ট্রাক্টরের রোজগার আর প্রায় থাকেই না বলা চলে। ফলে কৃষক বা গ্রামীণ উদ্যোক্তার পক্ষে লোন বা লিজের মাসিক কিস্তি প্রদানও সম্ভব হয়ে উঠবে না।

যেহেতু জমি চাষের জন্য ট্রাক্টর একটি অপরিহার্য কৃষিযন্ত্র, যা চাষের খরচ কমানো, শ্রমনির্ভরতা হ্রাস করা এবং সময় সাশ্রয়ের জন্য কৃষিকাজে এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে যথেষ্ট আলোচনার এখন আর দরকার আছে বলে মনে হয় না। এটি বোধগম্য যে ট্রাক্টরের ব্যবহারে কৃষককে উৎসাহিত করা খুব প্রয়োজন। যেহেতু শুধু কৃষিকাজ করে প্রয়োজনীয় রোজগার বা ব্যবসায়িক সাফল্য লাভ সম্ভব নয়, তাই ট্রাক্টরের বহুমুখী ব্যবহারও খুব প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে গ্রামীণ সড়কে কৃষিপণ্য পরিবহন যেমন করা যায়, তেমনি ভোগ্যপণ্য পরিবহনও করা যায়। গ্রামীণ হাটবাজার, মোকাম, গঞ্জ ইত্যাদিতে কৃষিপণ্য দ্রুত পরিবহন বর্তমান সময়ে ব্যবসার গতিশীলতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে। ট্রাক্টর এক লিটার ডিজেলে দশ থেকে বারো মাইল যাতায়াত করতে পারে, যা একটি ট্রাক বা এ রকম পরিবহন করতে পারে পাঁচ বা ছয় মাইল। তাছাড়া ট্রাক্টরের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও খুবই কম। ট্রাক্টরে ব্যবস্থাপনার জন্য একজন ড্রাইভার যথেষ্ট। ফলে মাইলপিছু যাতায়াত খরচ ট্রাক্টরে ট্রাকের বা এমন পরিবহনের এক-চতুর্থাংশ। ট্রাক্টরে স্বল্পদূরত্বে স্বল্পসংখ্যক মালামালও পরিবহন করা যায়। ফলে ট্রাক্টর কৃষিকাজের বাইরেও কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য একটি প্রয়োজনীয় মাধ্যম।

যে বিষয়টির দিকে আমাদের নজর দিতে হবে তা হচ্ছে ট্রাক্টরের ড্রাইভারের ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণ। সে বিষয়টি অর্জন করা খুব কঠিন হবে না। যেসব কোম্পানি ট্রাক্টরের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তারা ড্রাইভার ট্রেনিং ও ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণের জন্য ড্রাইভারদের সহায়তা করতে পারে। কৃষিপণ্য পরিবহনের প্রয়োজনীয়তা এবং চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে নাসিমন, করিমনের মতন কন্ট্রোলিং গিয়ার কিংবা ব্র্যাক, স্পিডমিটার ইত্যাদিবিহীন ডিজেল ইঞ্জিনের ব্যবহার বিভিন্ন স্থানে বেড়ে যাচ্ছে, যা সড়ক পরিবহনকে বিপদগ্রস্ত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রিকশাভ্যান কিংবা ব্যাটারিচালিত যান। এসব যানও পরিবহন ব্যবস্থাকে হুমকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। কম ওজনের বা স্বল্প মালামাল স্বল্প দূরত্বে পরিবহনের জন্য ভোক্তা এসব পরিবহন ব্যবহার করছে। এ ক্ষেত্রে ভোক্তার চাহিদা মেটানোর জন্য ট্রাক্টর যথেষ্ট সহায়ক একটি যান। বর্তমানে সড়কে ট্রাক্টর চলাচলে কোনো নীতিমালা না থাকার ফলে কৃষিপণ্য পরিবহন যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ট্রাক্টরের মালিকদেরও রোজগার বন্ধ হচ্ছে। এতে গ্রামীণ উদ্যোক্তারাও কৃষিযন্ত্রে বিনিয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে।

ট্রাক্টরের মাধ্যমে যান্ত্রিকীকরণ ও পণ্য পরিবহনকে এগিয়ে নিতে হলে কোনো সার্ভিস প্রভাইডারকে ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংকঋণ সহজলভ্য করতে হবে। কৃষি পর্যায়ে বাকিতে বিক্রির মাধ্যমে আমাদের ঋণের বোঝা ভারী হয়ে গেলে, সারা দেশ থেকে কিস্তি আদায়ের মতো ক্ষমতা বা সুবিধা না থাকলে আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানও কখনো বড় সমস্যায় পড়ে যেতে পারে। তখন যান্ত্রিকীকরণের মূল কাজই ব্যাহত হবে। কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হলে আমাদের কৃষকদের সরাসরি ব্যাংকঋণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থায় সাধারণত ট্রাক্টর, কম্বাইন হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, রিপারের মতো যন্ত্রপাতির জন্য কৃষক এখনো সরাসরি ব্যাংকঋণ পেতে নানান অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। সরকার কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে কৃষকের জন্য ভর্তুকি নিশ্চিত করতে পেরেছে। কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কহারও সর্বনিম্ন। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত কৃষি ও পল্লীঋণ নীতিমালা প্রগতিশীল, কৃষিবান্ধব ও সময়োপযোগী। তবে ট্রাক্টর কেনায় সরকারের যে ঋণ নীতিমালা রয়েছে সেখানে দুটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। ঋণের সুদ কম থাকাই বাঞ্ছনীয় এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়কে ফসল তোলার মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা উচিত। তাহলে কোনো ঋণ নষ্ট হবে না, কৃষক সময়মতো ঋণ পরিশোধে সক্ষম হবেন। আমি মনে করি কৃষি উন্নয়নের জন্য আমাদের সবার কমিটমেন্ট আমাদের কৃষিকে আধুনিকতার পথে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রথম সোপান ট্রাক্টরের ব্যবহার জমি কর্ষণ। একটি ট্রাক্টরের জন্য কৃষক বা উদ্যোক্তাকে ১০-১২ লাখ টাকা খরচ করতে হয়, নিতে হয় লোন ব লিজ। একটি ট্রাক্টরের নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল আছে। বাংলাদেশে রক্ষণাবেক্ষণকে খুব গুরুত্ব দেয়া হয় না বিবেচনায় দশ-বারো বছরের মধ্যে ট্রাক্টরের কর্মক্ষমতা কমে যায়। ফলে নতুন ট্রাক্টর কিনতে হয়। যদি ট্রাক্টর ব্যবহার করে কৃষক বা উদ্যোক্তা তাদের ক্যাপিটালের রিটার্ন এবং লাভজনকতার নিরিখে প্রত্যাশিত উপার্জন না করতে পারেন তাহলে আমাদের কৃষিও ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এ কারণে ট্রাক্টরের বহুমুখী ব্যবহার প্রয়োজন, যা প্রথমত কৃষিপণ্য পরিবহনের সুযোগ। তাছাড়া সম্প্রতি সারা বাংলাদেশে মিউনিসিপ্যালিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও ট্রাক্টরের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে কাজ চলছে। ওয়াসার জরুরি পানি পরিবহনও এমন একটি কাজ। এসবই কোনো না কোনোভাবে পরিবহনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই পরিবহন ব্যবস্থায় ট্রাক্টর ব্যবহারের সরকারি নীতিমালা সহায়তা কৃষিকাজে ট্রাক্টরের ব্যবহার বৃদ্ধিকে সংকটমুক্ত করবে।

প্রকৌশলী সাদিদ জামিল: ব্যবস্থাপনা পরিচালক

দ্য মেটাল প্রাইভেট লিমিটেড

নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে
আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেড (IDLC) এবং সরকারের ICT বিভাগের ইকমার্স প্লাটফর্ম একশপ দেশের একটি যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে

২১ অক্টোবর ২০২০ তারিখে আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেড (IDLC) এবং সরকারের ICT বিভাগের ইকমার্স প্লাটফর্ম একশপ দেশের নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগের আওতায় থাকবে আর্থিক স্বাক্ষরতা বৃদ্ধি, নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ গ্রহণের যোগ্যতা বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় দিক- নিৰ্দেশনা সম্পর্কিত কর্মশালা যা আগামী মাসগুলিতে অনলাইন ও অফলাইন -দুইটি মাধ্যমেই আয়োজন করা হবে।
এই উদ্যোগে IDLC-এর প্রতিনিধিবৃন্দ মূলত নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক স্বাক্ষরতা বৃদ্ধি, হিসাবরক্ষণ ও ঋণ গ্রহণের যোগ্যতা বৃদ্ধি বিষয়ক কর্মশালাগুলি পরিচালনা করছেন , এবং পাশাপাশি a2i -এর প্রতিনিধিবৃন্দ উদ্যোক্তাদেরকে একশপ নামক অনলাইন মার্কেটের সাথে পরিচয় এবং সেখানে বেচা-কেনা সম্পর্কিত বিষয়গুলিতে সহযোগিতা করছেন।
উল্লেখিত যৌথ উদ্যোগটির মাধ্যমে আরও অনেক নারী উদ্যোক্তাবৃন্দ সরকারি নানান আর্থিক পরিষেবাগুলি থেকে উপকৃত হতে পারবেন এবং তাদের ব্যবসায় সাফল্য বৃদ্ধি করতে পারবেন বলে আশা রাখছে IDLC এবং একশপ।
‘IDLC পূর্ণতা’ আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বিশেষ ঋণ সেবা। a2i-এর সাথে উক্ত প্রকল্পটি IDLC পূর্ণতা-এর আনুষাঙ্গিক পরিষেবা সমূহের একটি উদ্যোগ।

ভারতীয় মৎস্যজীবীদের আক্রমণ শ্রীলঙ্কার নৌ-সেনার

ভারতের মৎস্যজীবীদের আক্রমণ করল শ্রীলঙ্কার নৌ-সেনা। অভিযোগ, মৎস্যজীবীরা শ্রীলঙ্কার জলসীমায় প্রবেশ করেছিলেন।

ভারতীয় মৎস্যজীবীদের পাথর ছুঁড়ে মারা হলো। ছিঁড়ে দেয়া হলো তাঁদের জাল। শ্রীলঙ্কা নৌবাহিনীর এই আক্রমণে একজন মৎস্যজীবী আহত হয়েছেন।

ভারতীয় মৎস্যজীবীদের দাবি, তাঁরা শ্রীলঙ্কার জলসীমায় প্রবেশ করেননি। তা সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কার সেনা এসে তাঁদের আক্রমণ করে। তারা বলে, শ্রীলঙ্কার জলসীমায় মাছ ধরা হচ্ছে। এই বিরোধের জেরে আহত হয়েছেন তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের এক মৎস্যজীবী।

অতীতে বহুবার তামিলনাড়ু অভিযোগ করেছে, শ্রীলঙ্কা তাদের মৎস্যজীবীদের আটক করেছে, তাদের ট্রলার বাজেয়াপ্ত করে রেখেছে, তাদের অযথা হয়রানি করা হচ্ছে। শ্রীলঙ্কার সাংসদরাও বহুবার এই প্রসঙ্গ সংসদে তুলেছেন। তাঁরা বারবার সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, মৎস্যজীবীদের এই হয়রানি বন্ধ করতে ব্যবস্থা নিক সরকার। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আলোচনা করা হোক। কিন্তু তারপরেও দেখা যাচ্ছে, ঘটনা বন্ধ হয়নি।

ভারতের সঙ্গে অধিকাংশ প্রতিবেশীর সম্পর্ক এখন খারাপ। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বরাবরই খারাপ। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীন ও নেপাল। বাংলাদেশের সঙ্গেও আগের সুসম্পর্কে কিছুটা চিড় ধরেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ভারত অবশ্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এই অবস্থায় শ্রীলঙ্কা সেনার এই আচরণ সামনে এলো। এই ধরনের ঘটনায় তামিলনাড়ু সহ দক্ষিণ ভারতে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছড়ায়। তাই এই ধরনের ঘটনাকে সচরাচর হালকাভাবে নেয় না ভারতের বিদেশ মন্ত্রক।

জিএইচ/এসজি(এনডিটিভি)

যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে চীনা অর্থনীতি?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র সপ্তাহখানেক বাকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম উত্তাপপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে এটি। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরেক দফায় হোয়াইট হাউজের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন কিনা, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে একটা কথা এখনই বলে দেয়া যায়, রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন, যিনিই মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসুন না কেন, তা নিয়ে চীন হয়তো খুব বেশি মাথা ঘামাচ্ছে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বিশ্ব রাজনীতিতেই সবচেয়ে বেশি চর্চিত বিষয়। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে যিনি হোয়াইট হাউজে আসবেন, তিনি অন্য দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের প্রতি কতখানি কৃপাদৃষ্টি দেবেন, তা নিয়ে চিন্তায় থাকে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকাররা। কিন্তু চীন এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের আনুকূল্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। তাদের অর্থনীতি এখন এতটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেছে যে কভিড-১৯ মহামারীর কারণে অন্যান্য দেশ যখন এখনো ধুঁকছে, চীন তখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে অনেকটা এগিয়ে গেছে। অর্থনীতির এই শক্ত ভিত্তিই দেশটিকে এতটা দুর্ভাবনাহীন থাকার সুযোগ করে দিয়েছে।

আগামী পাঁচ বছর চীনের অর্থনীতি কোন পথে এগোবে, তার কৌশল নির্ধারণের জন্য গতকাল থেকে বৈঠক শুরু করেছে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল কমিটি। এটি হবে দেশটির ১৪তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। বিশ্লেষকদের ধারণা, এ পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকবে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। গণমাধ্যমের জন্য এ বৈঠক উন্মুক্ত নয়। তাই বৃহস্পতিবার বৈঠক শেষ হওয়ার আগে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সম্পর্কে জানা যাবে না।

তবে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রশাসন নিশ্চয়ই এমন কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করবে, যাতে উত্তরণের পথে থাকা চীনের অর্থনীতি উত্কর্ষের আরো শিখরে আরোহণ করতে সক্ষম হবে। এরই মধ্যে নভেল করোনাভাইরাস সৃষ্ট মন্দা কাটিয়ে ওঠার মাধ্যমে চীনের পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়েছে মসৃণ গতিতে। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটির প্রবৃদ্ধির গতিপথও বেশ আশাজাগানিয়া। এ গতিপথ থেকে চ্যুত না হলে আগামী এক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাবে—এমন ধারণা করছেন অনেকেই। আর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চাইছেন, তার দেশের অর্থনীতি এমন অবস্থানে উন্নীত হোক, যেন বহির্বিশ্বের কোনো ঘটনাই একে টলাতে না পারে।

এ উন্নতির শিখরে আরোহণের পথে জিনপিংয়ের প্রধান কৌশলই হলো স্বনির্ভরতা। বেইজিংভিত্তিক বেসরকারি ইকুইটি ফার্ম প্রিমাভেরা ক্যাপিটাল লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ফ্রেড হু বলেছেন, ‘আত্মনির্ভরতা হলো এমন এক কৌশল, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উদ্ভাবন, গবেষণা ও উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ। বাইরের পরিবেশ যখন অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ থাকে, তখন এর চেয়ে দূরদর্শিতাসম্পন্ন কৌশল আর কিছু হতে পারে না।’

অবশ্য আত্মনির্ভরশীল হওয়ার অর্থ এই যে চীন তাদের দীর্ঘদিনের ‘ওপেন ডোর’ নীতি থেকে একেবারে সরে আসবে, তা মনে করেন না আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও গোল্ডম্যান স্যাকস গ্রুপের সাবেক কর্মী ফ্রেড হু। বরং শি জিনপিং ও তার কর্মকর্তারা এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, চীনের অর্থনীতি ভবিষ্যতে বহির্বিশ্বের জন্য আরো বেশি উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। বাইরের বিনিয়োগকারীরা সেখানে অর্থ লগ্নি করতে পারবেন। বাজার প্রতিযোগিতার ন্যায্যতাও নিশ্চিত করা হবে। চলতি মাসেই শেনঝেনে এক বক্তব্যে জিনপিং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি একটি বিষয় স্পষ্ট করেন যে একটি নতুন উন্মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চান।

বৈদেশিক বাণিজ্য চীনা অর্থনীতির জন্য বড় একটি শক্তির জায়গা। প্রতিবেশী ও দূরবর্তী অঞ্চলে নিজেদের ভূরাজনৈতিক প্রতিপত্তি সুসংহত করার ক্ষেত্রেও জিনপিং প্রশাসনের জন্য অন্যতম অস্ত্র এটি। মহামারীর কারণে যখন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ নিজেদের অর্থনীতি সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে, তখন চীনের আমদানি-রফতানি দুটোই বাড়ছে। এতেই বোঝা যায় দেশটির অর্থনীতি কোন অবস্থানে পৌঁছেছে। এ গতি অব্যাহত থাকলে দেশটির যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেয়াটা পুরোপুরি যৌক্তিক। সুত্র:  ব্লুমবার্গ।

এপ্রিল-আগস্ট
পাঁচ মাসে ২৩% কমেছে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য

ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। প্রতিবেশী এ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বার্ষিক আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের আকার প্রায় হাজার কোটি ডলার, যার ৯০ শতাংশই আবার বাংলাদেশের আমদানি। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯ দুই দেশের মধ্যকার এ বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদি গতিহীনতা নিয়ে এসেছে। ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল-আগস্ট পাঁচ মাসে দুই দেশের মোট বাণিজ্য কমেছে ২৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে চলতি বছরের ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি শুরু হলে সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থমকে যায়। প্রায় বন্ধ হয়ে যায় স্থলবন্দরগুলো দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য। এর পেছনে বড় কারণ ছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কড়া লকডাউন।

ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর এপ্রিল-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২৭৩ কোটি ৫০ লাখ ২০ হাজার ডলারের বাণিজ্য হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩৫৫ কোটি ৩৮ লাখ ২০ হাজার ডলার। এ হিসেবে দুই দেশের মোট বাণিজ্য কমেছে ২৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এ পাঁচ মাসে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আমদানি বা দেশটিতে বাংলাদেশের রফতানি কমেছে ৪৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে রফতানি বা বাংলাদেশের আমদানি কমেছে ১৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে বাংলাদেশের এমন ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য কমে যাওয়ার মূল কারণ করোনার আঘাত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে করোনার প্রকোপ কমেনি। তাই তারা আগের মতো বাংলাদেশে পণ্য পাঠাতে কিংবা বাংলাদেশ থেকে পণ্য নিতে দ্বিধা-জড়তা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। শুধু তা-ই নয়, ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গেও যোগাযোগ কার্যত বন্ধ রেখেছে পশ্চিমবঙ্গ।

ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের ৮০ থেকে ৯০ ভাগই হয়ে থাকে পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে। আমদানি ও রফতানি বাণিজ্য পরিচালনায় বাংলাদেশ-ভারত ঘোষিত স্থলবন্দরের সংখ্যা ২৩টি। এর মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ১১টি। চালু এসব স্থলবন্দরের ছয়টিই পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। বন্দরগুলো হচ্ছে বেনাপোল, হিলি, ভোমরা, বুড়িমারী, সোনামসজিদ ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। করোনা পরিস্থিতির কারণে এসব বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের গতি অনেক কমে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (আইবিসিসিআই) সদস্যরা।

আইবিসিসিআই ভাইস প্রেসিডেন্ট শোয়েব চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, প্রধান স্থলবন্দরগুলো এখন খোলা। ওইদিকের লোকজন আমাদের তুলনায় বেশি আক্রান্ত। তাই ভারতীয়দের ক্ষেত্রে জড়তা, ভয়ভীতি, প্যানিক আছে। এসবের কারণে তারা এখনো ধীরগতিতে চলছে।

আইবিসিসিআই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে কভিড-১৯ মহামারীর শুরু থেকে গত জুন পর্যন্ত বেনাপোল বন্দরের বনগাঁও পৌরসভায় পার্কিং সিন্ডিকেটের কারণে মারাত্মক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের। ওই সময়ে বনগাঁওয়ে প্রায় তিন হাজার ট্রাক আটকে ছিল। পরে রেল কার্গো ব্যবহার করে আমদানি পুনরায় শুরু হওয়ায় পণ্য আটকে থাকার সময় ৯ থেকে ১০ দিনে নেমে এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি বেড়েছে, আরো বাড়বে এমন আভাসই পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে রফতানির পণ্য ভর্তি ২০০ ট্রাক বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করছে।

বাংলাদেশ ভারতে রফতানি করে এমন পণ্যের মধ্যে আছে পোশাক শিল্পের ওভেন ও নিটওয়্যার, হোম টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ফুটওয়্যার, কাঁচা পাট, পাটজাত পণ্য ও বাইসাইকেল। অন্যদিকে বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করে এমন পণ্যের মধ্যে আছে পেঁয়াজসহ মসলাজাতীয় পণ্য, তুলা, সুতা, সিরিয়াল, যানবাহন, সবজি, প্লাস্টিক, লবণ, বৈদ্যুতিক পণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, ফল ও কাগজসহ আরো অনেক পণ্য।

আইবিসিসিআই জানিয়েছে, ২০১৭-১৮ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত বেনাপোল বন্দর দিয়ে ৬৮ লাখ টন পণ্য ভারত থেকে আমদানি করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশী মুদ্রায় আমদানি হয়েছে ৬৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য। অন্যদিকে একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি হয়েছে ১১ লাখ টন পণ্য। বাংলাদেশী মুদ্রায় রফতানি হয়েছে ১৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার পণ্য।

আইবিসিসিআই অবৈতনিক জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল ওয়াহেদ বণিক বার্তাকে বলেন, দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এখনো স্বাভাবিক হয়নি, মোটামুটি চলছে। আমাদের আমদানি বেশি হচ্ছে, রফতানি কমে গেছে। পণ্য নিতে ভারতীয়দের দ্বিধা যেমন আছে, তেমনি ভারতে বিশেষ করে কলকাতা থেকে আন্তঃজেলা যোগাযোগ এখনো বন্ধ আছে। ফলে এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি, বরং খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। করোনাকালে তাই বাণিজ্য কমাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে ভারতে পণ্য রফতানির বিপরীতে বাংলাদেশে এক্সপোর্ট রিসিপ্ট বা অর্থ এসেছে ৪৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ২০২০ সালের একই সময়সীমায় ভারতে রফতানির বিপরীতে বাংলাদেশে অর্থ এসেছে ৩৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ হিসেবে চলতি বছরের প্রথমার্ধে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ভারতে পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশের আয় কমেছে ২৪ শতাংশ।

বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশের উৎস দেশ প্রতিবেশী ভারত। বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি তথ্যে এক্ষেত্রেও নেতিবাচক ধারা প্রকাশ পাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে ভারত থেকে পণ্য আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশের ১৭১ কোটি ৮ লাখ ডলার অর্থ ব্যয় হয়েছে। এর পরের প্রান্তিক এপ্রিল থেকে জুনে আমদানির বিপরীতে অর্থ ব্যয় হয়েছে ৮৮ কোটি ৫২ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১৮৩ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। সে হিসেবে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ভারত থেকে আমদানি ৫১ শতাংশ কমেছে। সুত্র: বণিক বার্তা

রেনাটার বিক্রি বেড়েছে ৮ শতাংশ

পুঁজিবাজারে তালিকভুক্ত ওষুধ খাতের কোম্পানি রেনাটা লিমিটেড গেল ২০১৯-২০ হিসাব বছরে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকার বিক্রি করেছে। এর আগের হিসাব বছরে কোম্পানিটির বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা। এক বছরে কোম্পানিটির বিক্রি বেড়েছে ৮ শতাংশ। একই সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফায় প্রায় ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

গতকাল অনুষ্ঠিত সভায় সর্বশেষ সমাপ্ত ২০১৯-২০ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন করেছে রেনাটা লিমিটেডের পর্ষদ। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১৩০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। ২০১৯-২০ হিসাব বছরে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী সমন্বিত মুনাফা হয়েছে ৪০১ কোটি টাকা। এর আগের হিসাব বছরে মুনাফা হয়েছিল ৩৭৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সমন্বিত আয় (ইপিএস) হয়েছে ৪৫ টাকা ২৯ পয়সা। এর আগের হিসাব বছরে ইপিএস ছিল ৪২ টাকা ৩৯ পয়সা। ৩০ জুন ২০২০ শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সমন্বিত নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ২৪৫ টাকা ৬৫ পয়সা। ২০১৯-২০ হিসাব বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সমন্বিত নিট পরিচালন নগদপ্রবাহ (এনওসিএফএস) দাঁড়িয়েছে ৫২ টাকা ৮৯ পয়সায়। ঘোষিত লভ্যাংশ ও অন্যান্য এজেন্ডা অনুমোদনের জন্য চলতি বছরের ১৯ ডিসেম্বর বেলা ১১টায় ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আহ্বান করা হয়েছে। এজন্য রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ নভেম্বর।

এর আগে ৩০ জুন সমাপ্ত ২০১৯ হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের মোট ১১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে রেনাটা লিমিটেড। এর মধ্যে ১০০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ। বাকি ১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ।

চলতি বছরের আগস্টে উচ্চ আদালতের অনুমোদনের ভিত্তিতে সাবসিডিয়ারি কোম্পানি রেনাটা অনকোলজিকে একীভূত করে নিয়েছে রেনাটা লিমিটেড। একীভূতকরণ স্কিম অনুযায়ী, রেনাটা অনকোলজি লিমিটেডের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে রেনাটা লিমিটেডের দশমিক শূন্য ২টি শেয়ার পেয়েছে কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডাররা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কোম্পানিটির শেয়ার সর্বশেষ ১ হাজার ১৩৬ টাকায় ৯০ লেনদেন হয়েছে। গত এক বছরে শেয়ারটির দর সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৫০ টাকা থেকে সর্বনিম্ন ৯৭২ টাকায় লেনদেন হয়েছে। সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে কোম্পানিটির মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) দাঁড়িয়েছে ২৬ টাকা ৮৭ পয়সায়, অনিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে যা ২৪ দশমিক ৭৬। সুত্র: বণিক বার্তা